মানসিক স্বাস্থ্য পরিচিতি । মানসিক রোগের লক্ষণসমূহ


যেখনে মানসিক রোগের ডাক্তার নেই - সেখানে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের আর্টিকেল পড়ুন সব মানসিক সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।



মানসিক স্বাস্থ্য - একটি পরিচিতি।


মানসিক স্বাস্থ্য ও মানসিক অসুস্থতা ও সুস্বাস্থ্য শারারিকভাবে সুস্থ একটি শরীরের চেয়েও ব্যাপকতর বিষয়। অর্থাৎ শারীরিকভাবে সুস্থ শরীর কেমন সুস্বাস্থ্যের মূল মাপকাঠি নয়। কারন সুস্থ দেহের সাথে সস্থ মনও একটি আবশ্যিক বিষয়। সুস্থ মনের একজন মানুষ স্বচ্ছ চিন্তা শক্তি সম্পন্ন, জীবনে চলার পথে আসা বিভিন্ন সমস্যা মােকাবেলায় সক্ষম, বন্ধুদের সা সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্কের অধিকারী, আত্মিকভাবে স্বচ্ছন্দ এবং তার চারপাশের মানুষদের সুখী করার মানসিকতা সম্পন্ন। এই নিরিখেই মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি বিবেচিত হয়। দেহ ও মন দুটি বহুল উচ্চারিত শব্দ। 


মানসিক রোগের লক্ষণসমূহ



দুটি ভিন্ন শব্দ হিসাবে আমাদের কাছে পরিচিত হলেও দেহ ও মন প্রকৃত পক্ষে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। বহু ক্ষেত্রে এরা একে অন্যের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত, যদিও আমাদের চারপাশের দুনিয়ায় দেহ ও মনের প্রতিক্রিয়ারপূথক পৃথক প্রকাশভঙ্গি আমরা দেখি । প্রকাশভঙ্গি পৃথক হলেও দেহ ও মন একটি অন্যটির সাথে অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত - একটি আক্রান্তহলে অন্যটি অবশ্যম্ভাবীভাবেই আক্রাচ্ছবে। সম্পূর্ন পৃথক দুটি বিষয় হলেও দেহ এবং মন কখনােই স্বতন্ত্র নয় বরং একে অন্যের সম্পূরক। শরীর যেমন অসুস্থ হতে পারে তেমনি মনও অসুস্থ হতে পারে। মনের এই অসুস্থতাকেই বলা হয় মানসিক অসুস্থতা। মানসিক অসুস্থতা হলাে; “একজন মানুষের এমন অসুস্থতা যা তার আবেগ, চিন্তা অথবা আচরণকে আক্রাঙ্করে, তার সাংস্কৃতিক চিন্তা চেতনা অথবা ব্যক্তিত্ত্বকে নড়বড়ে করে দেয়, যা তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। 



মূল যে দুটি বিষয়ের ভিত্তিতে এ ম্যানুয়েল রচিত: 


• মানসিক অসুস্থতা অনুধাবন, কারন নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রভূত অগ্রগতি সাধিত হওয়া। যার অধিকাংশ চিকিৎসাই একজন সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মী সাফল্যের সাথে করতে পারেন। 

• মানসিক অসুস্থতার সাথে অনেক স্বাস্থ্য সমস্যা জড়িত। অধিকাংশ মানুষই মনে করেন মানসিক অসুস্থতা মানেই মানুষের ভয়াবহ উদ্ভট আচার-আচরন। যেমন উত্তেজনা, ক্ষিপ্ততা বা সন্ত্রাসী আচরন এবং যৌনতার ক্ষেত্রে অসঙ্গতি। প্রকৃতপক্ষে এগুলাে হচ্ছে মারাত্মক মানসিক বৈকল্য (Severe Mental Disorder)। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির আচার-ব্যবহার ও দেখতে আর দশজন সাধারণ মানুষের মতই। 


যেমন : হতাশা, উদ্বেগ, যৌনসমস্যা, নেশাগ্রস্থতার মতন বহুল প্রচলিত মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রের শেষােক্ত বিবরন বিশেষভাবে প্রযােজ্য।


মানসিক অসুস্থতাকে কেন গুরুত্বের সাথে নিতে হবে ?

এখানে অনেক কারণ আছে, যার জন্য আপনার উচিত মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া। 


মানসিক রোগের লক্ষণসমূহ
• মানসিক অসুস্থতা আমাদের সবাইকে আক্রান্তকরতে পারে। এক হিসাবে দেখা গেছে প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন তার জীবনকালে একবার হলেও এ ই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্তহয় । এতেই প্রমানিত হয় “মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা” ১) কতােটা সাধারণ ও ব্যাপক। যে কেউ এই সমস্যায় ভুগতে পারে। 


• কারন মানসিক অসুস্থতা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি প্রধান বােঝা। বিশ্বের প্রায় সমস্ত ।


অঞ্চলে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, সাধারণ স্বাস্থ্য সেবা গ্রহনকারী ৪০%- এর বেশী প্রাপ্তবয়স্করা কোন না কোন মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে। সাধারণ বা কমিউনিটি স্বাস্থ্য সেবা গ্রহনকারীদের মধ্যে অনেকেই কৃত্রিম শারীরিক সমস্যার কথা বলে যাকে আমরা “সাইকো সােমাটিক (Psycho Somatic) বা অনুরূপ কোন নামে আখ্যায়িত করতে পারি। এদের অনেকেই প্রকৃতপক্ষে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। 


• মানসিক অসুস্থতা মানুষকে অনেকবেশী অক্ষম করে দেয়। যদিও 
একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলাে। মানসিক অসুস্থতা শারীরিক অসুস্থতার চেয়ে কম বিপদজনক কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানসিক অসুস্থতা। ব্যক্তিকে আরাে বেশী অক্ষম করে ফেলে। এমনকি তা মৃত্যুর কারনও হতে পারে। যেমন-দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বা আত্মহত্যা। কেউ যদি একই সাথে শারীরিক ও মানসিক উভয়বিধ অসুখে ভােগে
 
মানসিক স্বাস্থ্য পরিচিতি

সেক্ষেত্রে মানসিক অসুস্থতা তার শারীরিক অসুখকে আরাে গুরুতর করে তুলতে পারে। ২০০১ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) একটি রিপাের্টে বলা হয়েছে, মানুষের মারাত্মক অসুস্থতা যা ব্যক্তিকে সাধারন জীবন। যাপনে অক্ষম করে ফেলে এমন দশটি পরিস্থিতির মধ্যে চারটিই মানসিক অসুস্থতা জনিত। অবসাদগ্রস্থতা/বিষন্নতা (Depression) এমন একটি মারাত্মক বৈকল্য বা অসুস্থতা যা ব্যাপকতা ও ভয়াবহতার ক্ষেত্রে রক্তশূন্যতা বা ম্যালেরিয়ার মতাে মারাত্মক রােগের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে।
 


• কারন মানসিক স্বাস্থ্য সেবা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের। সাইকিয়াট্রিষ্ট, সাইকোলজিষ্ট বা অনুরূপ মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এই বিশেষজ্ঞরা। তাদের সময়ের সিংহভাগই মারাত্মক মানসিক বৈকল্য রােগীদের যেমন উন্মাদ (সাইকো) এর পিছনে ব্যয় করে। অথচ বহুল প্রচলিত মানসিক অসুস্থতা যেমন বিষন্নতা, হতাশা, মদ্যপান বা মাদকাসক্তির মত মানসিক অসুস্থতা নিয়ে অধিকাংশ মানুষই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়না। অথচ সাধারন স্বাস্থ্যকর্মীরাই এই অসুখগুলাের

যথাযথ চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে পারে। 


• কারন আমাদের সমাজ ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। গােটা পৃথিবী জুড়েই সমাজ ব্যবস্থায় আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটছে। আয়ের ক্ষেত্রে বৈষম্যের কারনে বাড়ছে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য, নগরায়ন, ব্যাপক উন্নয়ন, প্রযুক্তির আগ্রাসন ইত্যাদি সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তিমূলে আঘাত হানছে - বদলে যাচ্ছে সমাজের নিজস্ব গঠন। তৈরী হচ্ছে অভিঘাত - যার ফলে বেকারত্ব ও অপরাধ প্রবনতার হার বাড়ছে। এইগুলাে রুগ্ন মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত।


 • কারন মানসিক অসুখ কলংকে পরিণত হয়। অধিকাংশ মানুষ যারা মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে তারা এই অসুস্থতার কথা কখনই স্বীকার করে না। সিংহভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যারা মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে (তা যে ধরনেরই হােক না কেন) তাদের পরিবার ও সমাজ থেকে অত্যন্ত বৈষম্যমূলক নেতিবাচক হীন আচরণ পেয়ে। থাকে। এমনকি স্বাস্থ্য কর্মীরাও অধিকাংশক্ষেত্রে এদের সাথে সহানুভূতিসম্পন্ন আচরন করেনা ।


 • কারন মানসিক অসুখ তুলনামূলক কম খরচে ও সহজে চিকিৎসা সম্ভব। এটা সত্য যে কিছু মানসিক অসুস্থতা সারানাে সম্ভব নয় অর্থাৎ নিরাময়। যােগ্য নয়। কিন্তু শারীরিক অসুখের ক্ষেত্রেও এই সত্য প্রযােজ্য। যেমন। ক্যানসার, ডায়বেটিস, উচ্চরক্তচাপ বা হাই ব্লাডপ্রেসার, রিউমাটয়েড (74/ আর্থারাইটিসের মতাে অসুখ কখনই সারানাে যায় না। কিন্তু চিকিৎসা। প্রদানের মাধ্যমে রােগীর অবস্থার উন্নতি করা যায় বা তার প্রাত্যহিক জীবনের কষ্ট লাঘব করা যায়। মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রেও এই সত্য সমানভাবে প্রযােজ্য।


মানসিক অসুস্থতার প্রকারভেদঃ

মানসিক অসুস্থতা নির্ণয় ও শনাক্ত করার ক্ষেত্রে আপনাকে প্রায় পুরােপুরি লােকে কি বলে তার উপর নির্ভর করতে হবে। রােগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্রধান অবলম্বন হলাে রােগীর ইন্টারভিউ বা সাক্ষাৎকার (অধ্যায়-২)। মানসিক অসুস্থতার লক্ষন সমূহ ভােক্তভুগী অথবা তার নিকটজনরা লক্ষ্য করে।


মানসিক অসুস্থতার লক্ষন সমূহ প্রধানতঃ ৫(পাঁচ) প্রকার :

(ক) • শরীরবৃত্তীয় ও দৈহিক বা সােমাটিক (Somatic) লক্ষণ ও এগুলাে শরীরকে অথবা শারীরিক ক্রিয়াকেআক্রান্ত

করে। যেমন ব্যথা (Aches), টায়ার্ডনেস বা ক্লান্তি বা ঘুমের ব্যাঘাত । এটা মনে রাখা দরকার যে, মানসিক অসুস্থতা প্রায়শই শারীরিক লক্ষণে প্রকাশ পায় ।


মানসিক স্বাস্থ্য পরিচিতি ।



(খ) • অনুভূতিগত (Feeling) ও আবেগের লক্ষণসমূহ (Emotional Symptoms)  এই ক্ষেত্রে আদর্শ 

উদাহরন হলাে ভয় পাওয়া বা দুঃখবােধ। 


(গ) • চিন্তাগত (Thinking) ও Cognitive Symptoms ও আদর্শ উদাহরন হলাে আত্মহননের চিন্তা, কেউ ঐ ব্যক্তির ক্ষতি " করতে যাচ্ছে, চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্রে জটিলতা বা ভুলে যাওয়ার প্রবনতা ইত্যাদি। 


(ঘ) • আচরনগত (Behaving): Behavioural Symptoms: এই লক্ষণ সমূহ একজন ব্যক্তির আচরনের সাথে সম্পৃক্ত।

যেমন; কেউ আগ্রাসী আচরণ করছে বা আত্মহত্যার চেষ্টা করছে। 


(ঙ) • কল্পনাগত Imagining) ও Perceptual Symptoms ও এই লক্ষণসমূহঃ ইন্দ্রিয়ের অঙ্গ সম্পর্কিত যেমন; রােগী কিছু।

শব্দ শােনে অথবা দেখে যা অন্য মানুষ দেখে না বা শােনে না (হেলুসিনেশন)। বাস্তবে, এই লক্ষণসমূহ একে অন্যের সাথে ঘনিষ্টভাবে জড়িত। ছবিগুলাে দেখলেই বােঝা যাবে এই ব্যক্তির মধ্যে কতাে বিভিন্ন রকম লক্ষণ দেখা যেতে পারে।



মানসিক রোগের লক্ষণসমূহ




মানসিক অসুস্থতা প্রধানত ছয় প্রকার :

সাধারণ মানসিক বৈকল্য (Common Mental Disorder) ও অবসাদগ্রস্থতা/বিষন্নতা (Depression) ও উদ্বেগ (Anxiety)।

• বদ অভ্যাস” যেমন মদে বা ড্রাগে আসক্তি বা অপব্যবহার।

• মারাত্মক মানসিক বৈকল্য Pschyo (সাইকো)।। 

• মানসিক অবদমন অথবা প্রতিবন্ধিতা। 

• বয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। 

• শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। 



১.৩.১ সাধারণ মানসিক বৈকল্য (Common Mental Disorders) ও অবসাদগ্রস্থতা/বিষন্নতা (Depression) ও উদ্বেগ (Anxiety)।


কেসঃ ১.১

লুসি যখন প্রথম সন্তানের মা হয় তখন সে একজন ২৩ বছর বয়সী তরুণী। বাচ্চা হবার কয়েকদিন পর থেকেই লসির মধ্যে এক মিশ্র অনুভূতির জন্ম নেয়। তার কেবল কান্না পায়। ধাত্রী তাকে আশ্বস্ত করে যে, নতুন মায়েদের অনেকের ক্ষেত্রেই এটা ঘটে এবং এই অবস্থাটি স্বাভাবিক ও সাময়িক। তিনি লুসি ও তার স্বামীকে একে অন্যকে আরাে বেশী। সময় দিতে ও বাচ্চার দেখাশােনা করতে উপদেশ দেন এবং বলেন যে এতে লুসির ।


মানসিক অবস্থার শীঘ্রই উন্নতি হবে। সত্যিই কয়েকদিনের মধ্যে 

লুসির অবস্থার । উন্নতি হয় এবং মাসখানেক বা বেশ কিছুদিন সে ভালভাবেই কাটায়। তারপর ক্রমশঃ পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। লসি ক্রমশঃ ক্লান্ত, অবসন্ন ও দুর্বল বােধ। করতে থাকে। তার ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। অবসন্ন বা ক্লান্ত থাকলেও ভাের বেলায়। তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তার মনে সব সময় তার নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ভাবনা খেলা করে এবং সে আতঙ্কিত হয়ে আবিষ্কার করে যে তার শিশুটিকে ঘিরেও তার নানা নেতিবাচক ভাবনা খেলা করছে। ক্রমশঃসে ঘরের কাজ কর্মে। অমনােযােগী হয়ে পড়ে। লুসির দায়িত্বের প্রতি এই উদাসিনতায় লুসির স্বামীও প্রচন্ড বিরক্ত ও ক্ষিপ্ত হয়। ফলাফল সংসার কুরুক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়। কমিউনিটির। একজন সাধারণ স্বাস্থ্য কর্মী রুটিন মাফিক লুসির বাচ্চার চেকআপ করতে গিয়ে। লুসির রােগ নির্ণয় করে ও তাকে সারিয়ে তােলে। সমস্যাটি কি ছিল ও লুসি আসলে এক ধরনের মানসিক অবসাদগ্রস্থতায়/বিষন্নতায় (Depression) ভুগছিল যা নতুন মায়েদের ক্ষেত্রে প্রায়শঃই ঘটে। এ ধরনের অবসাদগ্রস্থতাকে বলা হয় প্রসব উত্তর অবসাদগ্রস্থতা (Postnatal Depression)।


কেসঃ ১.২।

রীতার বয়স ৫৮ বছর। বছর খানেক হলাে সে বিধবা হয়েছে। তার 


সন্তানেরা জীবন / আমার সারা শরীরে ব্যথা এবং জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহরবাসী হয়েছে। তার স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই তার । আমি রাতে ঘুমাতে পারি না।। ক্ষুধা ও ঘুম দুটোই কমে যায়। বিশেষ করে তার স্বামীর অন্তেষ্টিক্রিয়াশেষ করে তার সন্তানেরা কর্মস্থলে ফিরে গেলে রীতার অবস্থা আরাে খারাপ হয়। দিনে দিনে তার। মাথাব্যথা, পেটব্যথা, কোমরব্যথা ও আরাে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। স্থানীয় ক্লিনিকে গেলে। ডাক্তাররা তাকে পরীক্ষা করে জানান যে তার কিছুই হয়নি। তবে তাকে কিছু ঘুমের ঔষধ। ও ভিটামিন দেয়। কিছু দিন সে ভালই কাটায় বিশেষ করে তার ঘুমেরও উন্নতি হয়। কিন্তু। দুই সপ্তাহের মধ্যেই তার ঘুমের সমস্যা আরাে ভয়াবহ আকার ধারন করলে ক্লিনিকের ডাক্তাররা তাকে আরাে ঘুমের ঔষধ ও ইনজেকশন দেয়। কয়েক মাস পরে ফলাফল এই দাঁড়ায় যে রীতা ঘুমের ঔষধ ছাড়া ঘুমাতেই পারে না। সমস্যাটি কি ছিল ? স্বামীর মৃত্যুতে রীতা অবসাদগ্রস্থতায়/বিষন্নতায় (Depression) ভুগতে শুরু করে যা শারীরিকভাবেই প্রকাশ পায়। তার সন্তানেরা শহরে চলে যাওয়ায় সে নিঃসঙ্গতায় ভুগতে শুরু করে। ক্লিনিকের ডাক্তার তার আবেগ ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে কোন খুঁজ না নিয়েই তাকে ঘুমের বড়ি দিলে সে ঘুমের বড়ির। উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।



কেসঃ ১.৩


রবি, বয়স ৩০ বছর। একদিন পেছনের সীটে এক বন্ধুকে নিয়ে মটর  সাইকেল চালিয়ে। যাচ্ছিল। পেছন থেকে একটি বাস মটর সাইকেলটিকে ধাক্কা দিলে রবি ও তার বন্ধু দুজনই ছিটকে পড়ে। দুর্ভাগ্যক্রমেরবির বন্ধু সরাসরি বাসের চাকার নীচে পড়ে ও ঘটনাস্থলেই মারা যায়। পুরাে ঘটনাটি ঘটে রবির চোখের সামনে। শােক কাটিয়ে উঠার। পর রবির এক নতুন সমস্যা দেখা দেয়। নানা রকম ভয় পেতে শুরু করে সে। একদিন। যখন সে মার্কেটে বাজার করছিল, তখন হঠাৎ তার মনে হয় তার দম আটকে আসছে। ও তার হৃদস্পন্দন জোরে জোরে হচ্ছে। রবির বাবারও হার্টের সমস্যা ছিল। রবি এই ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে যে তারও হার্টের অসুখ হয়েছে। ডাক্তারী পরীক্ষায় দেখা যায়। রবির হার্ট সম্পূর্ণ সুস্থ। এরই মধ্যে রবি দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করে। দুঃস্বপ্নের ভেতর সে পুরাে এক্সিডেন্টটি দেখে। এমনকি জেগে থাকা অবস্থায়ও সেই দুর্ঘটনার নানা ছবি তার চোখে ভাসে। উদ্বেগ ও ভয় রবিকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে। তার রাতের ঘুম উধাও হয়ে যায়, এমনকি এক পর্যায়ে সে আত্মহত্যার কথা ভাবতে শুরু করে।


সমস্যাটি কি ছিল ও রবি প্রকূপক্ষে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা জনিত অসুস্থতায় (Anxiety Illness) ভুগছিল। কোন ব্যক্তি যদি ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় তাদের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটতে পারে। কখনও এটাকে Post Traumatic Stress Disorder বা ভয়াবহ অভিজ্ঞতা উত্তর চাপজনিত বৈকল্য বলে। 


সাধারণ মানসিক বিশৃঙ্খলা বা বৈকল্যের ক্ষেত্রে রয়েছে দুই প্রকারের আবেগ জনিত সমস্যা। যথা: অবসাদগ্রস্থতা/বিষন্নতা (Depression) ও উদ্বেগ (Anxiety)। অবসাদগ্রস্থতা/বিষন্নতা (Depression) মানে হলাে মন খারাপ, দুঃখবােধ, বেদনার্ত, বীতশ্রদ্ধা কিংবা মনের শােচনীয় অবস্থা। অবসাদগ্রস্থতা/বিষন্নতা। (Depression) মানুষের জীবনে একটি অতি সাধারণ আবেগ। এটি এমনই। সাধারণ আবেগ যে, এটাকে একটা পর্যায় পর্যন্ত স্বাভাবিক” বলা যায়। কারন সারাজীবনে একজন মানুষ কখনও না কখনও দুঃখ-কষ্ট বেদনার অনুভূতির ভিতর দিয়ে যায়। অধিকাংশ মানুষই সেই দুঃখ কষ্টের মাঝেও স্বাভাবিক জীবন যাপন করে যায়। সমস্যা হলাে তখনই যখন উল্লেখিত মানসিক অবস্থাটি দীর্ঘকালব্যাপি চলতে থাকে অথবা তা ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবন-যাপন দৈনন্দিন কার্য ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি করে, তার কাজের ক্ষতি করে, কিংবা ঘরে শিশুদের লালন পালনের আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়। অবসাদগ্রস্থতা/বিষন্নতা (Depression) এর প্রধান বৈশিষ্ট্য সমূহ ছক নং ১.১ - এ দেয়া হলাে। 


ভয় পাওয়া ও নাভাস হওয়ার অনুভূতির উম্মাদনাই হলাে উদ্বেগ। অবসাদগ্রস্থতা (Depression) এর মতােই উদ্বেগ (Anxiety) জীবনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে একেবারেই স্বাভাবিক”। যেমন মঞ্চে উঠার আগে একজন অভিনেতা কিংবা পরীক্ষা শুরুর আগে একজন পরীক্ষার্থী স্বভাবতই উৎকণ্ঠা বা মানসিক চাপ অনুভব করবে। কিছু লােক আছে যারা সব সময়ই উদ্বিগ্ন থাকে কিন্তু দৃশ্যত তা মানিয়েও নেয়। অবসাদগ্রস্থতা/বিষন্নতা (Depression) এর মতই উদ্বেগ (Anxiety) তখনই অসুখ হিসাবে বিবেচিত হবে যখন তা দীর্ঘায়িত হয়। (সাধারণত দুই সপ্তাহ বা তার চেয়েও বেশী), যখন তা ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনে বিপত্তি সৃষ্টি করে অথবা তা মারাত্মক উপসর্গ হিসাবে প্রকাশিত হয়। উদ্বেগ (Anxiety) এর প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলাে ছক নং ১.২-এ দেয়া হলাে।


মানসিক বৈকল্য সম্পন্ন অধিকাংশ মানুষের মাঝে একই সাথে। অবসাদগ্রস্থতা/বিষন্নতা (Depression) ও উদ্বেগ (Anxiety) এর লক্ষণ/উপসর্গ। দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রােগীরা তাদের আবেগ অথবা চিন্তার ক্ষেত্রে সে অসুবিধার অভিযােগ না তােলে তাদের শারীরিক বা আচরনগত উপসর্গ নিয়ে আলাপ করে। (যেমনটি ঘটেছে কেস নং ১.২-এ)। এর নানা কারন থাকতে পারে। যেমন অসুস্থ ব্যক্তি তার মানসিক সমস্যার কথা এড়িয়ে যায় এই ভেবে যে সবার কাছে সে “মেন্টাল” বা “পাগল” হিসাবে গণ্য হবে (৫.১.১)।


তিন প্রকারের সাধারণ মানসিক বৈকল্য (Common Mental Disorders) - এর ক্ষেত্রে রােগী নিম্নরূপ কতকগুলাে সুনির্দিষ্ট অভিযােগ কিংবা অস্বাভাবিক অভিযােগ করে :

• Panic বা আতংক। উদ্বেগ (Anxiety) যখন মারত্মকভাবে 


আক্রমকরে তখনই ব্যক্তি আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে। আতংকগ্রস্থ অবস্থা সাধারণত অল্প। কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়। মূলতঃ আতংক এর অভিঘাত আসে হঠাৎ করে। এবং এর সাথে মারাত্মক উদ্বেগের শারীরিক লক্ষণও ফুটে উঠে। আক্রান্ত। ব্যক্তি তার সাথে ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে অথবা সে মরে যাচ্ছে এই ভেবে। দিশাহারা হয়ে পড়ে। আতংকের অভিঘাত (Panic Attack) ঘটে কারন। মানুষ ভয় পেলে তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত হয়ে। পড়ে। এই দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যক্তির রক্তের রসায়নে পরিবর্তন ঘটায় যা। শারীরিক উপসর্গ হিসাবে ফুটে উঠে। 


ভীতি বা ফোবিয়া (Phobia) হলাে কোন ব্যক্তি যখন কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতে ভয় পায় (প্রায়শঃই আতংকগ্রস্ত বা Panic Attack- এর শিকার), (যেমনটি ঘটেছে কেস ১.৩-এ)।  


• অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন পরিস্থিতির উদাহরন হলাে বাজার, পাবলিক বাস, বদ্ধ স্থান - যেমন ছােট রুম, লিফট এবং সামাজিক পরিস্থিতি যেমন লােকজনের সাথে সাক্ষাৎ ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে আক্রান্তব্যক্তি উদ্বেগ (Anxiety) জনিত কারনে ভয় পায় বলে সে এসব পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে চায়। ভীতি বা ফোবিয়ার মারাত্মক অবস্থায় রােগী এমনকি ঘরের বাইরে যাওয়াও বন্ধ করে দেয়। Obsessive – Compulsive Disorder - হলাে। যখন রােগীকে বার বার একই ভাবনায় পেয়ে বসে (Obession বা অবদমন) অথবা বার বার একই জিনিস করতে থাকে যদিও সে জানে এটা অনুচিত বা অপ্রয়ােজনীয় বা বােকার মতাে কাজ। 

• Obsession ও Compulsion এত ঘন ঘন ঘটতে পারে যে, তা রােগীর মনসংযােগ ক্ষমতা/মনােযােগকে বিক্ষিপ্ত করে দেয় এবং রােগীকে অবসাদগ্রস্থতা/বিষন্নতা (Depression) এর দিকে ঠেলে দেয়। 


অবসাদগ্রস্থতা/বিষন্নতা (Depression) ও উদ্বেগ (Anxiety) এর ক্ষেত্রে উপদেশ এবং এই সমস্যা সমাধানে করনীয় বিষয়ে অধ্যায় ৫ ও অধ্যায় ৭-এ। আলােচনা করা হয়েছে।



 “খারাপ অভ্যাস"


কেসঃ ১.৪। 

এই কেসের রােগীর নাম মাইকেল । বয়স ৪৪ বছর।  নানান শারীরিক অসুবিধা। নিয়ে সে কয়েকমাস যাবৎ চিকিৎসকের 


কাছে যাওয়া আসা করছে। তার প্রধান। অসুবিধা/ অভিযােগ গুলাে ছিল এমন – সে ভাল ঘুমাতে পারছেনা, সকাল বেলা। প্রায়ই তার বমি পায় - তার শরীর খুব ভাল অনুভব করেও না ইত্যাদি। একদিন পেটে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে সে ডাক্তারের কাছে আসে। এন্টাসিড খেয়েও। তার কাজ হচ্ছে না দেখে ডাক্তার তাকে স্বাভাবিকভাবেই এন্টাসিডের সাথে। রেনিটিডিন গ্রুপের ঔষধ যা সাধারণ পাকস্থলীর আলসারের (Stomach Ulcer) - এর কার্যকর ঔষধ] লিখে দেন। মাইকেল বেড়িয়ে যাওয়ার সময়। ডাক্তার লক্ষ্য করেন যে সে প্রচন্ড ঘামছে এবং তার হাত কাপছে। ডাক্তার মাইকেলকে ডেকে তার অন্য কোন সমস্যা আছে কিনা জিজ্ঞেস করতেই মাইকেল কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। ডাক্তারের জিজ্ঞাসাবাদের উত্তরে আসল সত্য বেরিয়ে আসে। কয়েকমাস আগে মাইকেল কাজের চাপ সইতে গিয়ে মদ খাওয়া শুরু করে এবং দিন দিন তা বাড়তে থাকে এবং তা বর্তমানে অসহনীয় অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে। এখন সে কয়েক ঘন্টাও মদ ছাড়া থাকতে পারে না।


সমস্যাটি কি ছিলঃ মাইকেলের সমস্যাটি ছিল মদের উপর নির্ভরশীলতা। যে সব অসুবিধার কথা সে বলতাে সেগুলাে হলাে এ্যালকোহলের দ্বারা সৃষ্ট শরীরের ক্ষতির ফল । কিছু লক্ষণ ছিল শরীর হঠাৎ এ্যালকোহল না পেলে যে প্রতিক্রিয়া হয় তা। সাধারণভাবে এটি প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ বা Withdrawal Symptoms হিসাবে ব্যাপক পরিচিত।



কেসঃ ১.৫ঃ


লী একজন ১৮ বছর বয়সী হাইস্কুল ছাত্র। পড়াশুনায় মােটামুটি

পরিশ্রমী ও সৎ ছেলে। সম্প্রতি লীর মা লক্ষ্য করেছেন যে তার ছেলে অনেক রাত করে ঘরে ফেরে, তার পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হচ্ছে এবং ছেলের টাকার চাহিদাও বেড়ে গেছে। গত সপ্তাহে। লীর মায়ের ব্যাগ থেকে কিছু টাকা চুরি হলে লীর মা ভয় পান যে তার ছেলেই চুরি করেছে। সে আরও অভিযােগ করেছে যে, ইদানিং সে তার পুরনাে বন্ধুদের সঙ্গ ছেড়ে নতুন বন্দুদের সাথে সময় কাটায়। পুরনাে বন্ধুদের সাথে বাবা মায়ের পরিচয় থাকলেও নতুন বন্ধুদের সাথে সে তার বাবা মায়ের পরিচয় করিয়ে দেয় না। লী হেরােইনের উপর। নির্ভরশীলতার মা লীকে স্বাস্থ্যকর্মী কাছে নিয়ে যেতে চাইলে সে কোন উৎসাহই দেখায়। যাই হােক, স্বাস্থ্যকর্মী লীর বাসায় আসে। প্রথম সাক্ষাতে লী অনমনীয় মনােভাব দেখায়। স্বাস্থ্যকর্মী পরম ধৈর্য্যের সাথে দিনে দিনে লীর আস্থা অর্জন করলে লী। স্বীকার করে যে সে হেরােইন নেশাখাের। কয়েকমাস ধরেই এই নেশা করছে এবং এ এখন সে পুরােপুরি আক্রান্ত। 


বহুবার সে এই নেশা ছেড়ে দেবে বলে স্থির করেছে কিন্তু প্রতিবার সে এতাে অসুস্থ হয়ে পড়ে যে আবার সেই পথেই তাকে পা বাড়াতে হয়। মনে প্রাণে সে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছে কিন্তু মুক্তির পথ তার জানা ছিল না।



সমস্যাটি কি ছিলঃ

লী হেরােইন এ নির্ভরশীল। এ কারনেই তার পরীক্ষার ফল দিন দিন খারাপ হচ্ছিল, নতুন বন্ধু জুটেছিল কারন তারাও নেশাখাের । নেশার টাকা জোগাতে সে চুরিও শুরু করেছিল। কাউকে মদ/এ্যালকোহল বা ড্রাগের উপর নির্ভরশীল তখনই বলা যাবে যখন এর ব্যবহার ঐ ব্যক্তির শারীরিক - মানসিক স্বাস্থ্য সামাজিক জীবনে ক্ষতিকর রূপে আবির্ভূত হয়। সাধারণত এই দ্রব্যগুলাের ব্যবহার বন্ধ করলে শারীরিক যন্ত্রনা ও সেই নেশা করার এতাে প্রবল ইচ্ছা হয় (এগুলােকে প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ বা Withdrawal Symptom বলে) যে, নেশাকারী ব্যক্তির পক্ষে নিজে নিজে এ দ্রব্য গ্রহণ বন্ধ করা সম্ভব হয় না। মাদক (এ্যালকোহল/ ড্রাগ) একই সাথে যে গ্রহণ করছে তার শারীরিক-মানসিক ক্ষতি তাে করেই ক্ষতির কারন হয় নেশাকারীর পরিবার ও সমাজ। এ্যালকোহলের কথাই ধরা যাক। এটা কেবল মদ্যপায়ীর শরীরের ক্ষতিই করে না এর সাথে জড়িয়ে আছে আত্মহত্যার উচ্চহার, দাম্পত্য সমস্যা, পরিবারে নির্যাতন, সড়ক দুর্ঘটনা, আর্থিক অনটন এসব সমস্যার জন্য এ্যালকোহল একটি গুরুত্বপূর্ণ কারন। 

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মদ্যপ ব্যক্তি তার মদ্যপান সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয় না বরং অন্য অসুবিধার কথা নিয়ে এদের কাছে আসে। তাই আপনাকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে এবং লােকদের পানের অভ্যাস আছে কিনা সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে হবে। এটি আরাে বেশী জরুরী যখন ডাক্তারী রিপাের্ট (Clinical Report) এই ধারনা দেয় যে উপসর্গগুলাে পানজনিত (Drinking Habit) কারনে হতে পারে। মদ্য পানের উপর। নির্ভরশীলতার মূল বিষয় গুলাে বক্স ১.৩-এ দেওয়া হলাে।


নেশার জন্য এ্যালকোহল ছাড়াও নানান ধরনের ড্রাগ ব্যবহৃত হয়। যেমন: গাজা, আফিম, হেরােইন, কোকেন, ঘুমের ঔষধ, উত্তেজক ঔষধ যেমন “স্পীড” (বাংলাদেশে এর প্রচলন নেই বললেই চলে), ফেনসিডিল (বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত)। এছাড়াও ইদানিং ইয়াবা বা এমন আরাে কিছু ড্রাগের নাম শােনা যাচ্ছে। ড্রাগ আসক্তদের বৈশিষ্ট্য ১.৪ নং- ছকে দেয়া আছে। ড্রাগ বা এ্যালকোহল ছাড়াও কিছু বদ অভ্যাস আছে যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। যেমন: সিগারেট, ঘুমের। বড়ি খাওয়ার অভ্যাস, জুয়া ইত্যাদি।। 


অধ্যায় ৬- এ “বদ অভ্যাস” (Bad Habit) জনিত রােগীদের সনাক্তকরা ও তাদের সমস্যা সমাধান নিয়ে আলােচনা করা হয়েছে।



মারাত্মক মানসিক বৈকল্য ও উন্মাদ বা সাইকোঃ

এই গ্রুপে রয়েছে তিনটি প্রধান রােগ: সিজোফ্রেনিয়া, মেনিক ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার (Manic Depressive Disorder) এটি বাই পােলার ডিজঅর্ডার নামেও পরিচিত এবং সংক্ষিপ্ত সাইকোজ। এই রােগগুলি বিরল। আচরনগত সমস্যা এবং আজব কিংবা অস্বাভাবিক চিন্তাভাবনা এই রােগগুলিকে চিহ্নিত করেছে। এজন্যই মানসিক অসুস্থতার সাথে এই বৈকল্যগুলাে সবচেয়ে বেশী সম্পৃক্ত। মানসিক হাসপাতাল গুলােতে চিকিৎসারত রােগীদের সিংহভাগই উম্মাদ বা সাইকো।



কেসঃ ১.৬

ইসমাইলকে যখন চিকিৎসার জন্য ক্লিনিকে আনা হয় তখন তারবয়স ২৫। ক্লিনিকে আসার পর সে নিজেকে রুমে আটকে রাখত। ছাত্র 

হিসাবে সে ভালাে ছিল কিন্তু শেষ পরীক্ষায় সে খারাপ করে। তার মায়ের কাছে থেকে জানা যায়, ইসমাইল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত, আপন মনে বিড়বিড় করতাে যেন কারাে সাথে কথা বলছে ইসমাইলের বাবা-মা জোর করে তাকে ক্লিনিকে নিয়ে। আসে। প্রথমদিকে সে নার্সদের সাথে কথাও বলত না। দিনে দিনে একটু সহজ হয়ে উঠলে ইসমাইল জানায় তার বিশ্বাস তার বাবা-মা ও পড়শীরা তাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে। তারমতে স্বয়ং শয়তান তার সাথে কথাবার্তা বলে। ইসমাইল দাবী করে তার পড়শীরা তাকে নিয়ে যেসব কথাবার্তা বলে তা সে শুনতে পায় এবং তার দরজার ওপাশ থেকে পড়শীরা তাকে বাজে কথা বলে। তার মতে তার উপর কিছু ‘আছর’ আছে বা ভর করেছে। সে সম্পূর্ন সুস্থ এবং | ক্লিনিকে থাকার কোন যুক্তিই সে খুঁজে পায়না।


সমস্যাটি কি ছিল? ইসমাইল একটি মারাত্মক মানসিক বৈকল্য সিজোফ্রেনিয়ায়। ভূগছে। এ কারনেই সে নানা শব্দ শুনতে পায় ও নানা কাল্পনিক দৃশ্য দেখে যা || আদৌ সত্য নয় ।।


সিজোফ্রেনিয়া রো কি?


সিজোফ্রেনিয়া একটি মারাত্মক মানসিক অসুখ যা মানুষের ৩০ বছর বয়স হওয়ার আগে হয়। এ রােগে আক্রাক্তি আগ্রাসী হয়ে উঠবে কিংবা নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারে। এরা অন্যদের সন্দেহ করবে, অস্বাভাবিক জিনিস বা ঘটনা। বিশ্বাস করবে। যেমন: কেউ তার চিন্তাপ্রবাহে নাক গলাচ্ছে এমন। এরা হ্যালুসিনেশানেরও শিকার হতে পারে। যেমন: এমন শব্দ শােনা যা অন্যরা শুনছেনা। দুর্ভাগ্যক্রমেসিজোফ্রেনিয়ায় আক্রা্যক্তি নিজে থেকে স্বেচ্ছায় চিকিৎসা নিতে চায় না কারন অধিকাংশ আক্রান্তদ্ব্যক্তি তারা যে একটি অসুখে ভুগছে এবং এর চিকিৎসা প্রয়ােজন, - এটা মানতেই রাজী নয়। সিজোফ্রেনিয়া দীর্ঘমেয়াদী অসুখ যা কয়েকমাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এবং স্বভাবতই এর চিকিৎসাও দীর্ঘমেয়াদী।


সিজোফ্রেনিয়া রােগের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ ছক নং ১.৫ -এ দেয়া হলাে।



কেসঃ ১.৭ 

 প্রায় সপ্তাহ খানেক অস্বাভাবিক আচরন দেখে মারিয়ার স্বামী মারিয়াকে ক্লিনিকে নিয়ে আসে। মারিয়ার বয়স ৩১। প্রায় এক সপ্তাহ যাবত মারিয়ার আচরন হঠাৎ বদলে গেছে। তার ঘুম কমে গেছে এবং সারাক্ষণ ছটফট করে, ছােটাছুটি করে। সুগৃহিনী মারিয়া হঠাৎ করেই সাংসারিক কাজে উদাসীন হয়ে পড়ে। সে বেশী কথা বলা শুরু করেছে এবং বড় বড় কথা বলে। যেমন সে খুব ধনী ঘরের মেয়ে (বান্ত বে সে একজন সাধারণ শ্রমিকের বউ), সে মানুষের অসুখ ভাল করতে পারে ইত্যাদি। সে দামি দামি কাপড় চোপড়, কসমেটিক্স কিনতে শুরু করে। তার স্বামী। যখন তাকে ক্লিনিকে নিয়ে আসতে চাইলাে তখন সে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে স্বামীকে আঘাত করার চেষ্টা চালায়। পরিশেষে, প্রতিবেশীদের সাহায্যে মারিয়ার স্বামী। মারিয়াকে ক্লিনিকে ভর্তি করতে সমর্থ হয়। 


সমস্যাটি কি ছিলঃ মারিয়া “ম্যানিয়া” নামক মারাত্মক মানসিক রােগে ভুগছে। একারনেই সে বড় বড় কথা বলছে, বিশ্বাস করছে এবং তার স্বামী তাকে ক্লিনিকে ভর্তি করতে চাইলে তাকে আক্রমকরতে উদ্যত হয়েছিল। ম্যানিক ডিপ্রেসিভ ইলনেস (Manic Depressive Illness) বা বাইপােলার ডিজঅর্ডার মূলতঃ আবেগের দু’টি ভিন্ন শাখার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। | এই দুটি শাখা হলাে হাই মুড (High Mood) ফুর্তি বা তুরীয়ভাব এবং Low Mood- বৈরাগ্য বা মনমরাভাব। এই অসুখটি সাধারণত প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর হয় এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলাের কারনে (ছক নং ১.৬) সহজেই চোখে পড়ে। অবসাদগ্রস্থতার সাথে এর মনমরাভাব বা (Low Mood) এর অনেক মিল। যায়, তবে মুশকিল নিম্নভাব অনেক বেশী গুরুতর। এই অবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য দিক হলাে এই অবস্থা মেয়াদ। ভিত্তিক বা পালাক্রমিক এর অর্থ হলাে আক্রাব্ব্যক্তি কখনও কখনও সম্পূর্ণ সুস্থ সময় অতিবাহিত করে এমনকি ঐ সময়। যদি সে চিকিৎসাধীন না থাকে তবুও। আবার একটা মেয়াদে সে ঠিকই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সিজোফ্রেনিয়া রােগীর ক্ষেত্রে এমনটি দেখা যায় না। চিকিৎসাধীন নয়, এমন অবস্থায় সিজোফ্রেনিয়া রােগী অসুস্থ রয়ে যায়।



কেসঃ ১.৮ 


রিচার্ড হলাে একজন ৩৪ বছর বয়সী রােগী যিনি তিন দিন যাবত হঠাৎ সে উদ্ভট আচরন করছে। হঠাৎ করেই সে ভীষন অস্থিরতায় ভুগছে, আবােল-তাবােল বকতে শুরু করেছে, লজ্জাজনক কাজ করতে শুরু করেছে যেমন, লােকজনের সামনে হাঠৎ করে নিজের কাপড়-চোপড় খুলে ফেলে। অথচ তার ক্ষেত্রে মানসিক অসুস্থতার কোন পূর্ব ইতিহাস নেই। এই সব আচরন শুরুর দিনকয়েক আগে সে জ্বর ও মাথা ব্যাথায় ভুগছিল। তাকে যখন ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয় তখন তাকে বিভ্রান্ত/ উদভ্রান্ত লাগছিল । সে কোথায় আছে, আজ কি বার এসব কিছুই সে বলতে পারছিল না এবং কোন প্রশ্নেরই যথাযথ উত্তর দিতে পারছিল না। তার গায়ে বেশ জুর ছিল এবং পরে পরীক্ষায় ধরা পড়ে যে তার “সেব্রিাল মেলেরিয়া হয়েছে। 



সমস্যাটি কি ছিল ? রিচার্ড মারাত্মক মানসিক অসুখ যার নাম “প্রলাপ (Delirium), বিভ্রান্তি (Confusion) বা মারাত্মক উন্মাদনা Acute Psychosis এ। ভুগছিল। ম্যালেরিয়ার কারনে তার মস্তিষ্কে সংক্রমনেরফলে রিচার্ড উল্লেখিত মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়। Acute (তীব্র) বা Brief (সংক্ষিপ্ত) সাইকোসিস এবং সিজোফ্রেনিয়া একই রকম মনে। হতে পারে। পার্থক্য হচ্ছে এটি হঠাৎ করে শুরু হয় এবং এর স্থায়িত্ব কাল স্বল্প মেয়াদী । সাধারণতঃ এইসব রােগী একমাসের চিকিৎসাতেই সুস্থ হয়ে উঠে এবং এই রােগের ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসার প্রয়ােজন পড়ে না। সংক্ষিপ্ত সাইকোসিস এর কারন সাধারণতঃ এমন কোন ঘটনা যা মনের উপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে। যেমন কোন নিকটজনের মৃত্যু। কখনও কখনও মারাত্বক শারীরিক অথবা মস্তিষ্কের অসুস্থতা। সাইকোসিস এর কারন হতে পারে। যখন এমনটি ঘটে তখন তাকে বলা হয় প্রলাপ (Delirium)। ডিলিরিয়া রােগীর ক্ষেত্রে জরুরী ভিত্তিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয় ।




উপরোক্ত মানসিক রোগের সকল সমস্যা এবং মানসিক রোগের আলোচনা করা হয়েছে। যদি কোন মানসিক রোগ বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকে তাহেল আপনি আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। 


বিষেশ দ্রষ্টব্যঃ মানসিক প্রতিবন্ধী কি? 

জানতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।


নিচেন Contact Us যোগাযোগ করুন।



Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url